মহামারী আবহে অনলাইনে পালন শিক্ষক দিবস, ভার্চুয়ালেও মনখারাপ বহু পড়ুয়ার!

‘শিক্ষক দেশের সবথেকে ভালো মনের হন,’ বলতেন ডা: সর্বোপল্লী রাধাকৃষ্ণন। এই সেই ভালো মন, যাঁরা সমাজের মেরুদন্ড। তৈরি করেন একেককি উর্বর ক্ষেত্র। কিন্তু সমসাময়িক সময়ে, প্রাইভেট টিউশনের রমরমা থেকে, বিদ্যালয়ে ঠিকঠাক কাজ না করা, একাধিক প্রশ্নে, অভিযোগ খানিকটা গরিমা নষ্ট হয়েছে এই পেশার, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তা রয়েছে এখনও অমলিন। এখনও অনন্য। এবার করোনা মহামারীর মতো অযাচিত ভয়ঙ্কর সংকট থাবা বসিয়েছে শিক্ষক দিবস উদযাপনে ও। বিদ্যালয়ে, মহাবিদ্যালয় অথবা বিশ্ববিদ্যালয়, সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর মহাসমারোহে পালিত হবে না এই দিনটি। এই বছরের জন্য, বন্ধ থাকবে প্রায় সবটা। কিন্তু শ্রদ্ধা? নাহ্! এই আবহে এই উদযাপনে ভাটা পড়তে দিচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা। প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না সম্ভব হলেও, ভার্চুয়ালে এই কাজটি সারতেই তৈরি বহু পড়ুয়া। অনেক ক্ষেত্রেই অনলাইন ক্লাসের মতো অনলাইনেই জাঁকজমকহীন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত করতে চলেছেন তাঁরা। বিশেষত, বেসরকারি বিদ্যালয় বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই পদ্ধতিই মূলত আপন করে নেওয়া হয়েছে। অনলাইনেই ব্যবস্থা করা হয়েছে শিক্ষক দিবসের। আর যেখানে প্রতিষ্ঠানে ই আয়োজন করা হয়েছে, সেইক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের উপস্থিতিতে পালন করা হচ্ছে এই অনুষ্ঠান। তবুও অনেক ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতিও আয়ত্ত করেছেন শিক্ষকরা। মিলিয়ে মিশিয়ে অথবা একেবারে পালনহীন থাকছে কোনও কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এই প্রসঙ্গে, আমরা যোগাযোগ করেছিলাম রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। যাদবপুর নবকৃষ্ণ পাল বিদ্যালয়ের ভূগোলের শিক্ষিকা মমতা মণ্ডল (রায়) বলেন, আমাদের স্কুলে এবার অনুষ্ঠান ভার্চুয়ালি হচ্ছে। প্রাক্তনী সংসদের পক্ষে বিকেল ৩ টে থেকে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে এই অনুষ্ঠান। যাদবপুরের এই বিদ্যালয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে শিক্ষক দিবস পালন হলেও বিপরীত চিত্র, রাজ্যের প্রান্তিক এলাকার এক বিদ্যালয়ে! উত্তর ২৪ পরগণার কালিনগর এলাকার একটি স্কুলের শিক্ষিকা মালবিকা চক্রবর্তী জানান, ”আমাদের এবার কিছু ব্যবস্থা হয়নি, অনলাইন অনুষ্ঠান করাই যায় কিন্তু আমরা যাঁরা দূরে থাকি স্কুল থেকে, হয়তো ইন্টারনেট কানেকশন ঠিকঠাক, কিন্তু আমার ছাত্রছাত্রীরা? এই মহামারীর সময় তাঁদের নানান প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, প্রান্তিক এলাকার স্কুলের পড়ুয়াদের নিয়ে এটা করা মানে, অনেকেই বঞ্চিত হবে, সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া যাবে না, এই পরিস্থিতিতে আমি একজন শিক্ষিকা হিসেবে এটা চাইতে পারি না। আমাদের কাছে সবাই সমান। ওরা ভালো থাকুক এটাই কাম্য। আশাকরি, সব স্বাভাবিক হলে বা সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী আবার আমরা মিলিত হব আগের মত করে।”

দুই প্রান্তের দুই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন চিত্র দেখা গেলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই অনুষ্ঠান নামমাত্র রাখা হয়েছে। যদিও, বেসরকারি বিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি খানিকটা এগিয়ে। যেমন বারাসাতের অক্সিলিয়াম কনভেন্ট স্কুল, যাঁরা আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সের ভিডিও নিয়ে নিয়েছেন, আজই তা ভিন্ন ভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে দেখানো হবে। এই স্কুলের ছাত্রী অর্না জানায়, “আমি গান করেছি, আগেই মা রেকর্ড করে দিয়ে দিয়েছে, আজ দেখানো হবে।” এদিকে, সরকারের তরফে আজই, কমপক্ষে ৪০ জন বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী, ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষককে, ‘শিক্ষারত্ন’ পুরস্কার বিতরণ করা হবে করোনাবিধি পালন করেই।

মূলত, খানিকটা হতাশা, মনখারাপের বাসনার মধ্যেই পালিত হচ্ছে এবারের শিক্ষক দিবস। অনলাইন আয়ত্তেই মেতে উঠছেন ছাত্রছাত্রীরা। বঞ্চিতও থাকছেন বহু। তাঁদের আশা, আসছে বছর আবার হবে!
______________________
রিপোর্ট: রমেন দাস, কলকাতা
০৫.০৯.২০২০