রাজনীতিহীন, জাত-পাতে বরাবর অবিশ্বাসী সুশান্ত সিং রাজপুত : মিডিয়া এবং ‘নির্বাচনী ইস্যু’?

সাবলীল, সদা হাসিমুখের এক যুবক, প্রানবন্ত অভিনেতা! বরাবর ‘ভালো অভিনেতা’ হিসেবেই পরিচিত তিনি। একেবারে ‘পবিত্র রিস্তা’ (Pavitra Rishta) থেকে শুরু করে ‘দিল বেচারা’ (Dil Bechara), হিট-ফ্লপের বিনোদুনিয়ায় রেকর্ড তাঁর ভালোই। কিন্তু হঠাৎ মৃত্যু! আর তারপরেই একের পর এক বিতর্ক! সুশান্ত সিং রাজপুত আকস্মিক প্রয়াত হওয়ার পর, এই যাবৎকালের সর্বাধিক আলোচিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর মৃত্যু-রহস্য (Sushant Singh Rajput Death Case)। যা অন্য মাত্রা নিয়েছে সিবিআই তদন্ত (CBI Enquiry) এবং রিয়া (Rhea) প্রসঙ্গ আসার পরেই।

স্বাভাবিকভাবেই একজন এইধরণের মানুষের মৃত্যুর সঠিক বিচার আমরা প্রত্যেকেই চাইব এটাই স্বাভাবিক! বলিউড মাফিয়া, মাদক-যোগ (Drugs NCB) সমস্ত অভিযোগেরই সঠিক তদন্ত হবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে, এটাই বহু মানুষের বাসনা। কিন্তু একটি প্রশ্ন সাংবাদিকতার পেশা থেকে তুলতেই হবে! যেখানে গুরুত্ব দেওয়া উচিত সবপক্ষে। রাজদীপ সরদেশাই (Rajdeep Sardesai) রিয়ার ইন্টারভিউ নিয়ে ‘খারাপ’ কাজ করেছেন কিনা? অর্ণব গোস্বামী (Arnab Goswami) সারাক্ষণ, মহেশ ভাট (Mahesh Bhatt) সহ বলিউডের আরও সব প্রকাশ্যে আসা মহীরুহের নাম একসঙ্গে না বলে, সুশান্তের মৃত্যুর বিচারের দাবিতে শুধু রিয়াকেই মাঝখানে রেখে অন্য দের কেন আনছেন না? কেন মুম্বই পুলিশের তরফে অতিসক্রিয়তা? নেপথ্যে কে? পরিবারের ভূমিকা কী ? কেন রিয়ার সঙ্গে সেই সব মাথাদের বিরুদ্ধে বলছেন না? এসব প্রশ্ন বারবার এলেও সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গিতে দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তোলাটা দস্তুর! তাই যাঁর মতো করে তিনি নিজের টিআরপি বাড়াবেন এটাই স্বাভাবিক। যদিও, রিয়া চক্রবর্তী (Accused Rhea Chakraborty) অপরাধী হলে, তাঁর কঠিন শাস্তি হবে অবশ্যই! অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচার হবেই হবে, কিন্তু আমরা ঠিক কতটা নীতি পুলিশি করে, রিয়ার বিরুদ্ধে বলেও, সুশান্তের সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (Bank Account) এর নমিনি কেন তাঁর একজন আত্মীয় ছিলেন, বাবা বেঁচে থাকতেও কেন তিনি নন? সেই প্রশ্নটাও তুলব না। সুশান্তের মৃত্যুর বিচার চাওয়াটা কেন মূল লক্ষ্য হবে না? যদিও এই প্রসঙ্গে বিচার চলবে, তদন্ত চলছে, শাস্তি হবেই, সত্যি প্রকাশ হবেই।

কিন্তু এর মধ্যেই কঙ্গনা রানাওয়াত,সঞ্জয় রাউথ (Kangana Ranaut, Sanjay Raut) বিতর্কের পরেও মহারাষ্ট্র (Maharashtra) এবং বিহারের (Bihar Police) দ্বন্দ্বের পরেও, একটি বিষয় কিন্তু দিনের পর দিন বেশ মাথাচাড়া দিচ্ছে! এবং সেটি অত্যন্ত কার্যকরী যুক্তিসম্মত ইস্যু হিসেবেই সামনে আসছে! কী? রাজনীতি এবং সুশান্ত-মৃত্যু!

বরাবর অরাজনৈতিক ব্যক্তি, সম্প্রদায়গত বিভেদের তীব্র বিরোধিতা অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত করলেও, তিনি উদার এবং অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত একজন মানুষ হলেও, তাঁর মৃত্যুর পরেই, পরোক্ষে কিন্তু রাজনীতির একটা আবহ চলছে! এমনই দাবি করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা অংশ! যদিও এইদেশে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রত্যেকটা শব্দের মধ্যেই রাজনীতি থাকলেও, এই ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষে বেশ জড়িত! কীভাবে? কেউ কেউ বলছেন, বলিউড এই অভিনেতা, বিহারের সন্তান তো বটেই, অভিনেতার রহস্যজনক মৃত্যুর সঠিক তদন্তের দাবি করাটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তাঁকে ঘিরে ইতিমধ্যেই বিজেপি তৈরি করেছে পোস্টার মাস্ক! যেখানে লেখা, ভুলব না, ভুলতে দেব না, সঙ্গে রয়েছে বেশ উজ্বল আকারে বিজেপির দলীয় প্রতীক! এক এক করে বিভিন্ন কার্যকলাপ সামনে আসার পরেই উঠছে প্রশ্ন!


আরও পড়ুন; ”সুশান্তের নামে প্রচারের পোস্টার?”

https://khoborwalatv.com/bihars-bjp-released-poster-for-sushant-singh-rajput-before-election/


বিশ্লেষকদের একাংশের পর্যবেক্ষণ, অভিনেতার মৃত্যুর বিচার, দোষীদের কঠোর শাস্তি চাওয়াতে প্রতিযোগিতা কেন? এবং কে আগে সিবিআই তদন্তের দাবি করেছেন, কে বেশিবার এই ইস্যু তুলছেন, বিহারের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, লালু, তেজস্বী যাদব (Tejaswi Yadav) থেকে নীতিশ কুমার, বিজেপি থেকে রামবিলাস, তাঁর পুত্র চিরাগ পাসোয়ান (Ramvilas Paswan, Chirag Paswan) প্রত্যেকের মধ্যেই এই প্রতিযোগিতা কেন? তাঁদের আরও প্রশ্ন, বরাবর অরাজনৈতিক ব্যক্তি সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর এই ‘রাজনীতি’ ঠিক কতটা যুক্তিযুক্ত?

যদিও এখানেই রয়েছে একাধিক কারণ! কেন বিহার পুত্রের মৃত্যুর পরেও রাজনীতিক দৃষ্ঠিভঙ্গি অনুযায়ী এতটা প্রাসঙ্গিক?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিহারের বিধানসভা (Bihar Assembly Election 2020) নির্বাচন স্থগিত হয়নি সেটি আগামী নভেম্বরে হবে। কিন্তু এই নির্বাচনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক বিরাট ইতিহাস। তাঁরা বলছেন, বিহারের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশ মানুষ রাজপুত সম্প্রদায়ের। অর্থাৎ কয়েকলক্ষ মানুষ, বিহারের তথাকথিত উচ্চবর্ণের। দাবি, এই বর্ণের মানুষেরা আরও কয়েক শতাংশ মানুষের ভোট কোনদিকে যাবে সেটাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যাঁরা মূলত, নীতিশ কুমারের জেডিইউ (JD-U) এবং বিজেপির সঙ্গেই বেশি থাকেন। শুধু তাই না, বিহার বিধানসভার মোট ২৪৩ টি বিধানসভা আসনের মধ্যে প্রায় ৪০ টি বিধানসভা আসন রয়েছে যেগুলো কোনদিকে যাবে, অর্থাৎ কে জিতবেন সেটাও অনেকাংশেই নির্ভর করে, রাজপুতদের ভোটেই। অর্থাৎ এক কেন্দ্রগুলোতে রাজপুত (Rajput Community) ভোট যেদিকে তিনিই জিতবেন বলে সম্ভাবনা থাকে। ২০১৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৩০ টি আসনে প্রার্থী হন এই সম্প্রদায় থেকে। যেখানে বিজেপি, জেডিইউয়ের মহাগাঁটবন্ধনের (Bihar Mahagathbandhan) হয়ে লড়ে যেতেন ১২ জন। মোট ১৯ জন জিতে আসেন এই সম্প্রদায় থেকে। এইমুহুর্তে বাকি ২৪ জন সংখ্যালঘু, ৩৮ জন দলিত সম্প্রদায়ের, ৬৮ জন যাদব সম্প্রদায়ের বিধায়ক রয়েছেন, বাকি অন্যান্য। বর্তমান সমাজে জাত-পাত ব্যবস্থা না থাকলেও, বিহারের মতো রাজ্যের নির্বাচনে এই জাত-পাত সম্প্রদায় রাজনীতিই মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয় প্রতিবারই প্রায়।


যদিও প্রত্যেকটি দল রাজনৈতিক প্রচারাভিযানে এই ইস্যু আনছেন কিনা? কতটা যুক্তিযুক্ত সেটি? সেই বিষয়ে একটা প্রশ্ন থাকলেও, লালু (Lalu Prasad Yadav) থেকে বিজেপি, নীতিশের (Nitish Kumar) দল থেকে রামবিলাস প্রত্যেকের দলই দাবি করেছেন একটুও রাজনীতি নেই সুশান্তকে নিয়ে! কেন? সর্বভারতীয় ইংরেজি সংবাদমাধ্যম, ‘দ্যা প্রিন্টে’ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিহারের বিজেপি (Bhartiya Janata Party) সভাপতি সঞ্জয় জয়সওয়াল বলেছেন, ”সুশান্ত সিং রাজপুতকে নিয়ে রাজনীতির কোনও প্রশ্নই নেই। তিনি বিহারের সন্তান, সত্যি প্রকাশ হোক। তাঁর পরিবারও বিচার চাইছেন এর মধ্যে ভুল কী?” এদিকে আগেভাগেই লালু প্রসাদের দলের (RJD) বিখ্যাত নেতা, তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জে.পি যাদব (JP Yadav) বলেছেন, তিনিই আগে প্রধানমন্ত্রীকে (Narendra Modi) চিঠি লেখেন এই কাণ্ডের সিবিআই তদন্তের জন্য। আবার বিজেপির সংস্কৃতি বিষয়ক শাখার কার্যকর্তা বরুণ সিং জানান, তিনিই প্রথম চিঠি লেখেন। এদিকে নীতিশ সরকারের পূর্তমন্ত্রীর মাধ্যমেও আবেদন করা হয়েছিল বলেও শোনা যায়।

একটি অংশ এই প্রসঙ্গে বলছেন, মূলত বিহারের শহুরে এলাকা, পাটনা, এর পাশের একটা অঞ্চল এবং পূর্ণিয়া জেলায় সুশান্তের আদি বাড়ি থাকার কারণে, এই ঘটনা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতেই পারে। কিন্তু তাঁদের আক্ষেপ, যে মানুষটি আজীবন রাজনীতি আর জাত-পাত-সম্প্রদায় নিয়ে ভাবলেন না, এসবে বিশ্বাসই করতেন না, সেই উদার আধুনিক মানুষের মৃত্যুর পরের নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে এসবই যদি ‘ইস্যু’ হয়, তাহলে এটাও বেশ দৃষ্টিকটূ!


প্রতিবেদক: রঙ্গলাল গঙ্গোপাধ্যায়

০৬.০৯.২০২০

কলকাতা

#PostEditorial

পাঠকের কলমে…