Editorial| সর্দার প্যাটেল – “লৌহ পুরুষ” যাকে ছাড়া ভারত কল্পনা করা যায় না

রোহি রায়, কলকাতা:

ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন যেমন ছিল একটি কঠিন প্রস্তরীভূত পথ, ততটাই কঠিন ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী সময়। একটি বিশাল দেশ যাকে নতুন জগতের সঙ্গে দৌড়াতে হবে, ব্রিটিশদের হাতে যার সম্রাজ্য লুণ্ঠিত হয়েছে, এমন এক দেশ যেখানে প্রতিটি ছোট ছোট ক্ষেত্রে নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব – বিশাল এই ভারতকে নিজের হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল – ভারতের একতার প্রতীক।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর মজবুত রাষ্ট্র নির্মাণ করতে সর্দার প্যাটেল নিজের বুদ্ধিতে ৫৬০ স্বয়ং শাসিত দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতের সাথে বিলয় ঘটান। মূলত এই রাজ্যগুলি ছিল হিন্দু রাজাদের অধীনে এবং এক মজবুত রাষ্ট্রগঠনের স্বপ্নে সর্দার এই রাজাদের উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় দু’টি বিশেষ দেশীয় রাজ্য নিয়ে – একটি হলো হায়দ্রাবাদ এবং অন্যটি হলো বর্তমানের গুজরাটের জুনাগড়।

প্রথমে বল্লভ ভাই প্যাটেল জুনাগড়ের সমস্যার সমাধান করেন। জুনাগড়ের নবাব মুহাম্মদ রসুল খানজি জুনাগড়কে পাকিস্তানের অঙ্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা নবাবের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা শুরু করেন। পরিস্থিতির সঠিক ব্যবহার করে সর্দার প্যাটেল একটি সাক্ষরতার মাধ্যমে জুনাগড়কে ভারতের সঙ্গে বিলীন করেন।

কিন্তু প্যাটেলকে সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল হায়দ্রাবাদে। হায়দ্রাবাদ সেই সময় নিজামদের অধীনে ছিল এবং মুসলিম অধ্যুষিত এই ক্ষেত্রে ছিল প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব। কিন্তু এই ক্ষেত্রের ভৌগলিক অবস্থান এমনই যে এটি পৃথক রাষ্ট্র হলে ভারতের উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তৈরি হতে পারে একাধিক অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সমস্যা। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ইস্তফার তিন দিন আগে সর্দার প্যাটেল নিজামকে ভারতের সঙ্গে হায়দ্রাবাদের বিলয় ঘটানোর অনুরোধ জানান। কিন্তু প্যাটেলের সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে তিনি নিজের রাজাকারদের মাধ্যমে হায়দ্রাবাদে শুরু করেন হিন্দুদের গণহত্যা। ১৯৪৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্যাটেলের নির্দেশে ভারতীয় সেনা হায়দ্রাবাদে প্রবেশ করেন এবং সমস্ত ক্ষেত্রের দখল নিয়ে নেয়। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ যেখানে প্রায় ৪২ জন ভারতীয় সেনা এবং ২০০০ রাজাকার নিহত হয়। মাত্র চার দিনের মাথায়, ১৭ই সেপ্টেম্বর, নিজাম রেডিও বার্তার মাধ্যমে রাজাকার দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন এবং প্যাটেলের বিচক্ষণতা এবং চাপে হায়দ্রাবাদকে ভারতের অংশ হিসেবে স্বীকার করে নেন। শেষ হয় হায়দ্রাবাদে হিন্দুদের উপর অত্যাচার এবং তৈরি হয় এক অখণ্ড রাষ্ট্র।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে জহরলাল নেহেরু কেবলমাত্র জম্মু ও কাশ্মীরের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। সেই রাজ্যের সমস্যার সমাধান আজও হয়নি!

কিন্তু শুধুমাত্র একটি মজবুত অখন্ড রাষ্ট্র নির্মাণই নয়, ভারতের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় রয়েছে সর্দার প্যাটেলের অনস্বীকার্য অবদান। যখন ভারতের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১৯ অন্তর্গত ভারতীয়দের একাধিক অধিকার দেওয়া হয়, তখন তিনি তাঁর বিচক্ষণতায় অনুচ্ছেদ ১৯ এর অন্তর্গত বিভিন্ন উপখন্ড নিয়ে আসেন যাতে কোন ব্যক্তি এই অধিকারের অপব্যবহার না করতে পারেন। ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র হিতের এক অপরূপ মিলন ঘটিয়েছিলেন তিনি। ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার একাধিক ধারা তাঁর বুদ্ধি দ্বারা পুষ্ট। তাঁর উদ্যোগে সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারায় একাধিক বিধান রাখা হয় যাতে কোন ভারতীয়কে বর্ণ, ধর্ম, জাতি কিংবা জন্মের জন্য বৈষম্যের শিকার না হতে হয়। ধারা ১৭য় অচ্ছুত প্রথার অবলুপ্তি এবং ধারা ১৮য় জন্মজাত খেতাবের অবলুপ্তি তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। শুধু তাই নয়, ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে অনেকে বলতে শুরু করে যে কিছু বিশেষ ধর্মের মানুষের জন্য আলাদা আলাদা নির্বাচনী ক্ষেত্র তৈরি করা উচিত। ২৫ আগস্ট, ৯৯৪৭-এ সর্দার প্যাটেল এই চক্রান্তের তীব্র বিরোধিতা করে সেটা প্রতিহত করেন। তিনি বলেন এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ভারতের অখন্ডতা প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে যাবে।

২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে সর্দার প্যাটেলের সম্মানে গুজরাটের নর্মদার তটে নির্মিত হয় ১৮২ মিটার উঁচু সর্দার প্যাটেলের মূর্তি যার নাম দেওয়া হয় স্ট্যাচু অফ ইউনিটি। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্ট্যাচু।

সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের জন্মজয়ন্তীতে তাঁকে প্রণাম জানাই।