বাংলার হেঁসেলে গয়নাবড়ির মাহাত্ম্য এবং রবীন্দ্রনাথ।

বাংলার হেঁসেলে বড়ির ব্যবহার চিরন্তন। সুক্ত হোক বা চচ্চড়ি, লাবড়া কিংবা টকবড়ির ব্যবহার প্রায় সর্বত্র। নানারকম বড়ির প্রচলন থাকলেও শৈল্পিক দিক থেকে অগ্রগণ্য মেদিনীপুরের বিখ্যাত গহনাবড়ি বা গয়নাবড়ি। বর্তমান জেটযুগে যত আমাদের বাইরের খাবার প্রবণতা বাড়ছে, হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার একান্ত নিজস্ব খাদ্যগুলি। যার মধ্যে গয়নাবড়ি অন্যতম।

এই বড়ি কৌলিন্যতে টেক্কা দেবে আর ৫ টা সাধারণ বড়িকে। কারণ, এই বড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঠাকুর বাড়ির নাম!

১৯৩০ সালে সেবা মাইতি নামে শান্তিনিকেতনের এক ছাত্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তার মা হিরন্ময়ী দেবী ও ঠাকুমা শরতকুমারী দেবীর তৈরী গহনা বড়ি উপহার দেন। রবীন্দ্রনাথ গহনা বড়ির শিল্পকলা দেখে এতটাই আকৃষ্ট হন যে তিনি গহনা বড়িগুলির আলোকচিত্র শান্তিনিকতনের কলা ভবনে সংরক্ষণ করার অনুমতি চেয়ে হিরণ্ময়ী দেবী ও শরতকুমারী দেবীকে চিঠি লেখেন।
সে চিঠির বয়ানটি ছিল এইরূপ

“শ্রীমতী শরৎকুমারী দেবী (Sarathkumari Devi)ও শ্রীমতী হিরণ্ময়ী দেবী (Hironmoi Devi) কল্যাণীয়েষু,তোমাদের হাতে প্রস্তুত বড়ি পাইয়া বিশেষ আনন্দলাভ করিলাম। ইহার শিল্প নৈপুণ্য বিস্ময়জনক । আমরা ইহার ছবি কলাভবনে রক্ষা করিতে সংকল্প করিয়াছি।তোমরা আমার আশীর্বাদ জানিবে।শুভাকাঙ্ক্ষী শ্ৰী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইতি ২১ শে মাঘ / ১৩৪১।”

আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌলতে বাংলার ইতিহাসে ঠাঁই করে নেয় এই বড়ি। তবে শুধু রবি ঠাকুরই নন, গয়না বড়িকে শিল্পের মান্যতা দিতে চেয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তিনি এই বড়িকে খাওয়া মানে শিল্পকলা ধ্বংস করা বলে মনে করতেন। এমনকি নন্দলাল বসুও ছিলেন এর গুণমুগ্ধ।

শুধু ঠাকুর বাড়িই নয়, সত্যজিৎ রায় তাঁর আগন্তুক সিনেমায় এই বড়ির উল্লেখ করেছেন !
শতাব্দী প্রাচীন এই বড়ির উৎস রাঢ়বঙ্গের মেদিনীপুরে। সাধারণত কাঁসার থালায় বিউলি ডাল বেটে এই বড়ি দেওয়া হয়। তবে পর্তুগিজদের আগমনের পরে এই বড়িতে পোস্তর প্রচলন শুরু হয়। তবে সবচেয়ে মজার কথা হল ২০১৬ সালে এই গয়না বড়ির পেটেন্ট চেয়ে বসে খড়গপুর আইআইটি !!

কিন্তু এত কিছুর পরেও হারিয়ে যাচ্ছে এই বাংলার একান্ত নিজস্ব ঐতিহ্য। সময়ের অভাব এবং নিপুনতার অভাবে লুপ্ত হতে চলেছে এই গয়না বড়ি। জিআই স্বীকৃতি দাবি করছে এই শিল্প। তবেই বাঁচানো সম্ভব একে। নাহলে অদূর ভবিষ্যতে কেবল ইন্টারনেটেই দেখা মিলবে এর।


স্বাতী সেনাপতি

২৬.০৫.২০২০