কলকাতায় কমছে বাঙালির সংখ্যা? একান্ত এক্সক্লুসিভ আলাপচারিতায় বাংলপক্ষ

২০১৪ সালে প্রকাশিত টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বাঙালির সংখ্যা কমছে বঙ্গ তথা বাঙালির প্রাণকেন্দ্র কলকাতায়। কমে যাওয়ার ট্রেন্ড খুবই উদ্বেগজনক, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট ২০১৩-২০১৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী কলকাতায় বাঙালির সংখ্যা ৪৭%। অর্থাৎ, নিজ ভূমে, নিজের স্বপ্নের নগরীতে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ নেই বাঙালি। আর এই জনবিন্যাস এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে মহানগরীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে।

বাঙালির এরকম সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ কি কলকাতায়? এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় বা কি আছে! এই সমস্ত বিষয় নিয়েই খবরওয়ালা টিভির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে আলোচনা হল বাঙালির স্বার্থরক্ষার জন্য মাঠে নামার সংগঠন “বাংলা পক্ষ” এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কৌশিক মাইতির সঙ্গে।

আমাদের প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানান ২০২১ সালে কলকাতায় বাঙালির সংখ্যা ৩৯-৪১% এর বেশি হবে না। অর্থাৎ, আমরা যেটা পূর্ব প্রতিবেদনে দিকনির্দেশ করেছিলাম যে হয়তো চল্লিশের কোঠার কাছাকাছি হয়ে গিয়েছে বাঙালির সংখ্যা তাকে মান্যতা দিলেন। তিনি বাঙালির সংখ্যা এরকম ভয়ানক কমে যাওয়ার তিনটি প্রধান কারণ ব্যক্ত করেন। তাঁর কথায়, আমাদের এখানকার যারা রাজনৈতিক মাথা তাঁরা সেভাবে এই বিষয়ে সতর্ক নয়, সেজন্য ব্যবসাদাররা অন্য রাজ্য থেকে শ্রমিক নিয়ে এলেও কিছু বলে না। আর সেই সুযোগে আইটি থেকে বড়বাজার সব জায়গায় বিহারী শ্রমিকের বাড়বাড়ন্ত। যেহেতু পুঁজির নিয়ন্ত্রণ বাঙালির হাতে নেই সেজন্য কলকাতায় কাজের স্বার্থে ওরা কম টাকায় বিহার-ইউপি-ঝাড়খন্ড থেকে প্রচুর শ্রমিক নিয়ে আসে।

এছাড়া তিনি বাঙালির উল্লেখযোগ্য কম জন্মহার ও উল্টোদিকে অবাঙালিদের অতি জন্মহার এবং হিন্দি সাম্রাজ্যবাদকে বাঙালির সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করেন। তিনি জানান, “বিহার-ইউপি তে জন্মহার ৩.৫। সেখানে বাংলায় ১.৬। হিন্দু বাঙালির ১.৪, মুসলমান বাঙালির ২.২।” বিশেষত হিন্দু বাঙালির অতিরিক্ত কম জন্মহার নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি আমাদের প্রতিনিধিকে দুঃখ করে জানান আমাদের বাংলায় শিবসেনা কিংবা তামিল জাতীয়তাবাদীদের মতো কেউ নেই বা উড়িয়া দের মত সচেতন জাতিসত্তা বোধ গড়ে উঠেনি বাঙালির মধ্যে না হলে ছবি অন্যরকম হতো। তিনি বলেন, “ধরো বাংলায় আগে থেকে ১ কোটি বিহারী ছিল। তাঁরা ৩.৫ করে বাচ্চা নিচ্ছে। উল্টোদিকে ৮ কোটি বাঙালি ১.৫ করে বাচ্চা নিচ্ছে। তাহলে প্রতিবছর ওদের শতাংশ কিছু না কিছু করে তো বাড়তে থাকবেই।”

এরপর তিনি কলকাতায় বাঙালি কমে যাওয়ার প্রবণতা কমানো অর্থাৎ বাঙালি সংখ্যা পুনঃবৃদ্ধির জন্য ভূমিপুত্র সংরক্ষণে একমাত্র সমাধান বলে ব্যক্ত করেন। তাঁর দাবী,” পশ্চিমবঙ্গে সমস্ত চাকরির পরীক্ষায় বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সমস্ত বেসরকারি কাজ ঠিকাদার থেকে টেন্ডার লাইসেন্স সমস্ত কিছুতে ৯০% ভূমিপুত্র সংরক্ষণ করতে হবে।” এগুলো বাস্তবায়িত হলে জনসংখ্যার ব্যালেন্স এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে আশা প্রকাশ করেন তিনি। হয়তো একই রকম থাকবে কিন্তু এর থেকে খারাপ হবে না।

তবে এই প্রসঙ্গে তিনি মহারাষ্ট্র এবং অন্ধ্রপ্রদেশের স্থানীয় মানুষদের জন্য সংরক্ষণ এর পদ্ধতিগত পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান,” জাতিগত রিজার্ভেশন হতে পারে না। মহারাষ্ট্রে ওটা মারাঠা রিজার্ভেশন ছিল। বাংলা পক্ষ কি কখনো বলে বাঙালি রিজার্ভেশন? বলে ভূমিপুত্র রিজার্ভেশন। কারণ এটা স্টেট ডোমিসাইল। কোন জাতির নামে সংরক্ষণ করলে সুপ্রিম কোর্ট সেটা খারিজ করে দেয়। অন্ধ্রপ্রদেশ দু’বছর আগে ভূমিপুত্র সংরক্ষণ করেছে তাই খারিজ হয়নি সেই সংরক্ষণ।”

আমাদের প্রতিনিধি সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনে আউটসাইডার ভার্সেস ইনসাইডার তত্ত্বের উল্লেখ করে জানান কলকাতার অবাঙালি ভোট বিজেপি তে যাবে বলে ভাবা হয়েছিল যেমন যেরকম জোড়াসাঁকো বা রাসবিহারী, কিন্তু বাস্তবে গেল তৃণমূলের ঝুলিতে। তার কথায় ব্যাপারটা উপর-উপর এরকম মনে হলেও গভীরে গেলে অন্য রকমের জিনিস বোঝা যাবে। তিনি বলেন, যেখানে উর্দু মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে তৃণমূল জিতেছে। সেখানে হিন্দি হিন্দুরা ছিল না। যেমন মেটিয়াব্রুজ, পার্কসার্কাস, তোপসিয়া এইসব এরিয়া হলো উর্দু মুসলমানদের তাদের তৃণমূল ছাড়া কোনো চয়েজ নেই। তাই উর্দু মুসলমানদের ভোট একত্রিত হয় তৃণমূলের দিকে। এবং যেখানে দেখা গেছে হিন্দিভাষীর হয়েছে মানে বিহারী হিন্দুরা, জোড়াসাঁকোতে বিবেক গুপ্তা জিতেছে কিন্তু বড়বাজার এর পাঁচটা ওয়ার্ডে হেরেছে। কিন্তু উর্দু এলাকায় গিয়ে জিতেছে।” তাঁর কথায়, তৃণমূল জিতেছে মনে হচ্ছে অবাঙালি এরিয়াতে কিন্তু ওয়ার্ড ভিত্তিক অ্যানালিসিস করলে দেখা যাবে আসলে কে কোথায় ভোট দিয়েছে। বিধানসভা ভিত্তিক অ্যানালিসিস করলে হবে না। যেমন রানীগঞ্জে তাপস ব্যানার্জি জিতেছেন, কিন্তু যেখানে রানীগঞ্জে বিহারী এলাকা সেখানে তাপস ব্যানার্জি বোলে বোলে গোল খেয়েছে। জিতেছে পুরো বাঙালি এলাকায়।

তিনি বলেন, বাঙালির মধ্যে তো ট্যালেন্ট এর কোন অভাব নেই, অস্কার, নোবেল, ভাটনগর সবেতেই বাঙালির জয়জয়কার, ব্যাঙ্গালোরের আইটি শিল্প চালায় বাঙালিরাই। তার দাবি পশ্চিমবঙ্গের শিল্প হোক, ইনভেস্ট হোক। কিন্তু শুধু ইনভেস্ট হলেই হবে না সেই শিল্প ব্যবসা তে যেন বাঙালিরাই চাকরি পায়, কাজ পায় সেটা নিশ্চয়তা করতে হবে না হলে শিল্প-ইনভেসমেন্ট এসেও কোনো লাভ হবে না। এই প্রসঙ্গে তিনি বিস্ফোরক অভিযোগ করেন যে, “আসানসোলে বিভিন্ন জায়গায় বাঙালি হলে বা বাঙালি ভোটার কার্ড থাকলে তাকে চাকরি দেওয়া হচ্ছে না!” সঙ্গে তিনি বলেন,”মাইনোরিটি বোর্ডের টাকায় উর্দু একাডেমির মাধ্যমে ডাব্লুবিএসসি এর কোচিং এর দ্বারা বাঙালি মুসলিম এর হক ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে কারণ পশ্চিমবঙ্গের ৯০% মুসলিমই বাঙালি তারা উর্দু বোঝেনা।”

সবশেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে বাঙালি আবার তাদের বাংলা পক্ষের নেতৃত্বে জাগ্রত হচ্ছে। আউটসাইডার ভার্সেস বাঙালি ন্যারেটিভ থেকে প্রথম জয় বাংলা স্লোগান, ফেডারেল স্ট্রাকচার কি জিনিস বোঝানো, রাজ্যের ক্ষমতায়ন এইসব ইস্যু সবই তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত, এভাবেই বাঙালি তার অধিকার বুঝে নেবে বলে জানান তিনি।