রংচং মুখোশের আড়ালে সাদা কালো সার্কাসের জীবন ও তার বিবর্তনের গল্প

মুখে-চোখে রঙের বাহার, এদিক-ওদিক নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো, উড়ে বেড়ানো ভিন্ন রুপে, ভিন্ন সাজে….. কারা? চোখ বুঝলে কাদের কথা মাথায় আসে এই সাজে ! ঠিক ধরেছেন….জোকার, ক্লাউন, যাদের দেখে অনাবিল হাসি পায় | তাঁদের কাজই যে হাসানো, ধারাহাস্যকরের দেশে এ হাসানো পেশাই বটে | আদৌ তাঁরা কি হাসে? হয়তো বা আপেক্ষিক হাসে | অবশ্য আর পাঁচটা মানুষের মতন তাঁদেরও দুনিয়া আছে, রঙ-বেরঙের দুনিয়ার আড়ালে মনখারাপের দুনিয়া| সেখানে ওরা ওদের মতন হাঁসে-কাঁদে, তুলির রঙে নিজেদের মেলে ধরে | সার্কাস শব্দটা যেন ওদের সাথেই জড়িত, যেন জীবনের একটা মঞ্চ| যেখানে তাঁরা অভিনয় করে হাসানোর, কাঁদার, এ যেন এক জীবন পেয়েও অন্য পাওয়া জীবন| সার্কাসের সূত্রপথ বেজায় লম্বা, ইতিহাসও ভীষণ গম্ভীর| তবু বাঙালির সবেতেই আদিখ্যেতা | সার্কাস নিয়ে বাঙালির মনে একপ্রকার গভীর উত্তেজনা থাকলেও আজ কেমন আছে সেই সার্কাস পাড়া? কেমন কাটছে সেই জোকারদের রঙ-বেরঙের জীবন ! বাঙালীর সার্কাস বাঙালীর উদ্যমশীলতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আধুনিকতার ছোয়ায় বাঙালীর আবেগে পড়েছে ভাটা, আমরা আজ সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছি সেই সার্কাসের কথা, ওপরে রিঙের আড়ালে রঙ-বেরঙের খেলার কথা । শুধু তাই নয় দুঃখের কথা ‘সার্কাস’ কথাটা এখন বাংলা ভাষায় একটা শ্লেষাত্মক রূপ পেয়েছে ।

এই সার্কাসের হাত ধরেই চেনা বামন সম্প্রদায়ের মানুষদের| বেঁটে বলে সবাই অনায়াসে মজা ওড়ায়| অথচ এই উচ্চতাই বাঁধ মানেনা রিঙে ওঠা, নামা চলতে থাকে, তিনশো-চারশো লোককে হাসানো, অথচ মাইনে কয়েক হাজার মাত্র, জীবনের ঝুঁকিতে থোড়াই কেয়ার অথচ জোকারের জীবন যে এইরকমই| ওই উঁচু দড়ি, ঝুলন্ত দোলনায় ঝুলতে ঝুলতে নাটুকে মুহূর্ত তৈরি করে পড়ে যাওয়া, নিখুঁত সময়জ্ঞান— চাট্টিখানি কথা! তবু ওঁরা পেরেছেন।  যে রিঙে জোকারদের মুখ নয়, মুখোশটাই দেখতে আসে দর্শকেরা। যে মুখোশ হাসবে, হাসাবে। যে লালমুখো নাকওয়ালা মুখোশ দেখেই সবাই হেসে গড়াগড়ি যায়, সেটা সারাক্ষণ পরে থাকা যে কী রকম দমবন্ধ করা অভিজ্ঞতা, সে ধারণা ক’জনের আছে?

রাজ-রাজড়াদের আমলে ব্যঙ্গ-রঙ্গে সভা মাতাতে সিংহাসনের পাশেই থাকতেন বিদূষক। ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে ন্যাকা গলায় সুর কেটে যাওয়া লোকটাকে মনে পড়ে? অবশ্য তাঁকে ঠিক জোকারের পূর্বপুরুষ বলা যাবে না। বরং যে ভাঁড়েরা মাঠে-হাটে-মেলায় লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে, নিজেদের হাসির পাত্র করে তুলে চাষাভুষো-ব্যাপারি-মাতাল-গণিকাদের বিস্তর মজা দিতেন, তাঁরা জোকারের পূর্বসূরি বলে খানিক গণ্য হতে পারেন। শারীরিক কসরত আর ঠাট্টার তিরে নিজেকে বিঁধে, বোকামির বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠাই তো জোকারের আসল রসায়ন!

গ্রিক আর রোমান থিয়েটারে এক ধরনের বোকা চরিত্রের উপস্থিতি ছিল ধরাবাঁধা। জটিল নাটুকে টানাপড়েনের মধ্যে তারা হাসির খোরাক জোগাত। পরের চক্রব্যূহে ঢোকার আগে খানিক হাঁপ ছাড়ত দর্শক। উনিশ শতকের একেবারে গোড়ায় ব্রিটেনে জোসেফ গ্রিমাল্ডি পেশাদার জোকারের ধারণা নিয়ে আসেন। মুখে চড়া সাদা রং চাপানো নকশাও তাঁরই আমদানি। পরে তা-ই চালান হয়ে যায় সার্কাসে। সে হিসেবে গ্রিমাল্ডি-ই আধুনিক জোকারের স্রষ্টা। দিশি জোকারদের অনেকেই অবশ্য এ সব গল্প জানেন না। তাঁদের দৌড় বড়জোর
রাজ কপূরের ‘মেরা নাম জোকার’। আনমনেই গুনগুনিয়ে ওঠেন, জিনা য়হাঁ, মরনা য়হাঁ.. অবশ্য কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘ছোটদের ছবি ‘ তে তাঁদের জীবনের টানাপোড়েন, প্রেম, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায়| তাঁরাও ভালোবাসে, সংসার সাজায় রঙমেলাতে |

সার্কাসে অনেক ধরনের খেলা দেখানো হয় বলে বেশ প্রশস্ত জায়গা নিয়েই এর প্রদর্শনী চলে। পুরো কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে বড় ধরনের তাঁবু ব্যবহার করা হয়, যা ‘বিগ টপ’ নামে পরিচিত। সার্কাসের আকার সাধারণত গোলাকৃতি হয়ে থাকে। মাঝখানের গোলাকৃতি মঞ্চ যেটি ‘রিং’ নামে পরিচিত, সেখানে সকল খেলার প্রদর্শনী হয়ে থাকে। যিনি সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন তাকে রিংমাস্টার বলা হয়।

সার্কাসের ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরনো। বহু প্রাচীনকাল থেকেই রোম, মিশর ও গ্রিসের বিভিন্ন শহরে সার্কাসের খেলা দেখানো হতো। তখন যদিও একে সার্কাস বলা হতো না, তবে মূল বিষয় ছিল একই। সেই সময়কার সার্কাস এখনকার মতো এত আড়ম্বড়পূর্ণও ছিল না। তখনকার দিনে সার্কাস বলতে ছোটখাট আগুনের খেলা, লাঠি ঘোরানো, দড়ি খেলা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, ভারোত্তোলন ইত্যাদি দেখানো হতো। এর পাশাপাশি ছিল কিছু জন্তু-জানোয়ারের প্রদর্শনী, যা আজকের দিনের চিড়িয়াখানার চাইতে বেশি কিছু নয়।ব্রিটিশদের হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে সার্কাসের গোড়াপত্তন হয়|

কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে প্রায় প্রত্যেক বছর নিয়ম করে দেখানো হতো রাশিয়ান সার্কাস। এই জায়গার নামকরণও ওই সার্কাস প্রদর্শনকে ঘিরেই। সেই থেকেই শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক পর্যন্তও প্রতি বছরের শীতের আমেজ জমিয়ে রাখতো পার্ক সার্কাস ময়দান। আজ সব না দেখার দেশে| কালের প্রবাহে বিনোদনের মাধ্যমে এসেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন বিনোদন মাধ্যমগুলোর জৌলুশ। যুগের সাথে তাল মেলাতে না পারার কারণে আর বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠার কারণে বিলুপ্তির পথে এই প্রাচীন সংস্কৃতি। এইতো কিছুদিন আগেও আমরা মেলায় গেলে দেখতে পেতাম, মেলার সবচাইতে বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে সার্কাসের তাঁবু। আবার টেলিভিশনের পর্দায় বিদেশি সার্কাস দেখার আগ্রহও কোনো অংশে কম ছিল না। কিন্তু সময় আজ অনেক পরিবর্তিত। বিনোদনের এই মাধ্যমটি এখন মানুষের মুখে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের উপকরণ। তাই আজকের লেখায় রইল আধুনিকতার মেরুকরণে হারিয়ে যেতে বসা সার্কাসকে কিছুটা হলেও খুঁজে পাওয়ার অভিব্যক্তি। সেই ছোটবেলায়  থেকেই দেখে আসছি  কলকাতায় শীতের মরসুমের অন্যতম আকর্ষণ হল সার্কাস। এখন যে সমস্ত সার্কাস কলকাতায় আসে, তাদের কলাকুশলীদের মধ্যে বাঙালী কেউ আছেন কিনা জানি না, কিন্তু একসময়ে এক বঙ্গসন্তানের হাতে গড়া একটা সার্কাস দল সারা ভারতের খ্যাতি কুড়িয়ে ছিল। সেই অধ্যায়ের কথা আমরা অনেকেই আজ বিস্মৃত হয়েছি। তবে বাঙালীর সার্কাস এর পথে চলা শ্রী প্রিয়নাথ বসুর হাতে। প্রিয়নাথ বসু চব্বিশ পরগনার ছোট জাগুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর পিতা মনমোহন বসু হিন্দুমেলার অন্যতম সংগঠক ছিলেন। কবি এবং নাট্যকার শ্রী মনমোহন বসুর নাটক ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনীত হতো, বহু গানও তিনি রচনা করেন।উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আহিরীটোলা অঞ্চলের গৌরহরি মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যায়ামশিক্ষক কলকাতার বহু জায়গায় জিমনাস্টিকসের আখড়া স্থাপন করেন। সবকটি তাঁর একার পক্ষে দেখাশোনা করা সম্ভব হতো না বলে তিনি এর মধ্যে কয়েকটার ভার নিজের ছাত্রদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে একজন হলেন শ্রী প্রিয়নাথ বসু।ক্রমশঃ কয়েক বছরের মধ্যে‌ই গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস সারা ভারতে প্রসিদ্ধ হযে পড়ে, এবং এমন খুব কম‌ই করদ রাজ্য সে সময় ছিলো যেখানে খেলা দেখায় নি। ভারত ছাড়াও শ্রীলংকা, পেনাং, সিঙ্গাপুর, জাভা, নানা জায়গায় গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস খেলা দেখায়।
আজ সব মলিন হয়ে গেছে ঐ রিঙের আড়ালে | গোটা বিশ্ব ফুঁসছে করোনার বিষে | সব রঙ বেমানান| একেই জোকারদের জীবনে দুঃখের পাহাড় এর মধ্যে সঙ্গী করোনা | যাও বা বিয়ে বাড়ি জন্মদিন বাড়িতে ক্লাউন সেজে খেলা দেখিয়ে পাওয়া যেতো কিছু টাকা, করোনার সুবাদে তাও প্রায় বন্ধ হতে বসেছে| হয়তো সিনেমার পর্দাতেই থেকে যাবে এদের ইতিহাস, আফসোস| সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝুড়ি ঝুড়ি শেয়ার, দুঃখ পাওয়া | তবু এদের জীবনের দুঃখের স্বাদ র কি কেউ নেবে? হয়তো এইভাবেই হারিয়ে যাবে সার্কাসের সেই রঙ| হাতে গোনা শোর ডাক, এসব এখন বন্ধের পথে | কোনদিকে এদের ভবিষ্যত ! আমাদের জীবনে হাসি ছাড়াও যে এদের হাসি খুব দরকার, ভীষণ ভাবে দরকার| হাসতে পারে সবাই হাসাতে পারে আর কজন !