বিরিয়ানির সাতকাহন..

তিয়াষা দাস : ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই/
চিরদিন কেন পাই না…’
নানা, ভুল ভাবছেন। একতরফা প্রেমের কথা বলছি না। বলছি বিরিয়ানির কথা। বিরিয়ানির কথা মনে পড়েছে, অথচ খেতে পারেন নি। এরকম অনেক সময়েই হয়েছে। তখন এই গানটাই খালি মাথায় ঘোরে। কলকাতার গোলবাড়ির কষা মাংস আর আর্সেলনের বিরিয়ানি, মাছে-ভাতে বাঙালির মাছ খাওয়ার অভ্যাসটাই পাল্টে দিতে পারে। কথাতেই আছে ঘ্রাণে অর্ধভোজন, আর নাকে যদি একবার বিরিয়ানির গন্ধ আসে তাহলে না খেয়ে থাকা যায় না। মন করে আনচান, জিভে আসে জল। আর শুধুই কি গন্ধ! ওইযে হাঁড়ির লাল রংয়ের মায়াবী কাপড়টা… ওতে যেন একটা ম্যাগনেটিক পাওয়ার রয়েছে। দেখলেই যেন চোখ-মন আকর্ষিত হয়। বিরিয়ানির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সরু সরু চাল, হলদেটে রং, একটা লেগ পিস, পাশের ডিম, একটা বড় সাইজের আলু আর ওপর দিয়ে কষা কষা পিঁয়াজের ছোঁয়া। উফফ্ এতক্ষণ নিশ্চয় জিভে জল এসে গেছে! তবে এখানে বিরিয়ানির রেসিপি নয়, বিরিয়ানির ইতিহাসের কথা বলা হবে। জানতে তো সকলেরই ইচ্ছা হয় এই অপরূপ মোহ যুক্ত খাবারের উৎপত্তি কোথায়?

বিরিয়ানির আদি ইতিহাস-

ইতিহাস বলছে, বিরিয়ানির আমদানি হয়েছে বিদেশ থেকে। ‘বিরিয়ানি’ শব্দটিকে নেহাত দেশিও বলে মনে হলেও, আদতে এটা কিন্তু ফারসি শব্দ। ফারসি শব্দ ‘বিরিযঁ’ থেকে বিরিয়ানি শব্দটি এসেছে। ‘বিরিযঁ’ -এর অর্থ চাল। এবং ‘বেরিয়ান’ শব্দের অর্থ আগে ভেজে নেওয়া। যেহেতু পেঁয়াজ অর্থাৎ বেরেস্তা আগে থেকে ভেজে তুলে রাখতে হয়, তাই এর এমন নাম।

বিরিয়ানির কিন্তু অনেক রকম ফের রয়েছে। বাঁশের মধ্যে বিরিয়ানি, যাকে বলা হয় ব্যাম্বু বিরিয়ানি। এছাড়া রয়েছে মুঘলি বিরিয়ানি, দিন্দিগুল বিরিয়ানি। আবার অরকত বিরিয়ানি নামে বিরিয়ানিটির একটা ইতিহাসও রয়েছে। এই বিরিয়ানির সাথে দলচা(বেগুনের তরকারি) এবং পচড়ি(রায়তার মতন খাবার) পরিবেশন করা হয়। এতে সাম্বা চাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
গুজরাটের সিন্ধি অঞ্চলে উৎপত্তি বিরিয়ানিটি হল মেমনি বিরিয়ানি। এতে আবার ভেড়ার মাংস, দই, বাদামি পিঁয়াজ এবং আলু ব্যবহার করা হয়।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ভিত্তিক বিরিয়ানির নামকরণ হয়েছে। যেমন হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, বোম্বে বিরিয়ানি, কামপুরি বিরিয়ানি প্রভৃতি। এছাড়াও রয়েছে দুধ কি বিরিয়ানি, ভতকলই বিরিয়ানি, বিয়ারী বিরিয়ানি, তহরী বিরিয়ানি, একমাত্র মিষ্টি বিরিয়ানি হল ফল থলসেরী বিরিয়ানি।

বিরিয়ানির উৎস-

বিরিয়ানির প্রকৃত উৎস খাদ্য ইতিহাসবিদরা খুঁজে পাননি। সাফাদী সাম্রাজ্যের সময় আর্য ভূমিতে ‘বেরিয়ান পিলাও’ নামে এক ধরনের বিরিয়ানি তুল্য খাবার পাওয়া যেত। ঐতিহাসিক লিজি কলিংহামের মতে ভারতীয় শষ্যদানার খাদ্য ও আর্যভূমি ‘পিলাফ’ বা পোলাও, এই দুটি খাবার একই ধারণা থেকে প্রস্তুত খাদ্য, যা মুঘল দরবারে পরিবেশিত হত। যার নাম তিনি বিরিয়ানি বলে উল্লেখ করেছেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, ১৩৯৮ সালে ভারত সীমান্তে তুর্কি-মঙ্গল বিজেতা সম্রাট তৈমুর এসে পৌঁছান। যুদ্ধজয়ে বেরোনো তৈমুরের সেনাদের জন্য খাবার রান্না হতো বড় বড় মাটির হাঁড়িতে। একটা হাড়ির মধ্যে চাল, নানান রকমারী মশলা আর যে রকম জায়গায় যা মাংস পাওয়া যেত তা একেবারে ঠেসে ঠেসে হাঁড়ির মধ্যে চাপ করে ভরে দেওয়া হতো। এরপর সেটি ঢাকনা দিয়ে উনুনের মধ্যে চাপিয়ে দেওয়া হতো। এবং পরে সময়মতো তা বার করে পরিবেশন করা হতো। নবাব অরকতের আমলে এই বিরিয়ানির উদ্ভব।

ক্লান্তি দূরীকরণের উপাদান বিরিয়ানি-

বিরিয়ানির প্রকৃত উৎস সম্পর্কে ‘আইন-ই-আকবর’ গ্রন্থে কিছু ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সেই গ্রন্থ অনুযায়ী পোলাও আর বিরিয়ানির মাঝে কোনো তফাৎ ছিল না। শুধু পার্থক্য হচ্ছে বিরিয়ানি শব্দটা ভারতে বহু আগেই প্রচলিত ছিল। বিখ্যাত পরিব্রাজক আল বিরুনীর বর্ণনায় মুঘল সাম্রাজ্যের পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্য গুলোতে বিরিয়ানির উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে একদা শাহজাহানের সুলতানা মমতাজ সেনানিবাস ভ্রমণে আসেন। সেখানে তিনি সৈন্যদের অবসাদগ্রস্ত এবং দুর্বল দেখে, বাবুর্চিকে সেনাদের ক্লান্তি দূরীকরণের জন্য বিশেষ কোন খাবার প্রস্তুতের নির্দেশ দেন। বাবুর্চি চাল, অনেক ধরনের সব্জি এবং মশলাপাতি একসঙ্গে দমে দিয়ে তৈরি করে ফেললেন এক বিশেষ খাবার। এই খাবার এতো সুস্বাদু যে পরে তা রাজদরবারে ঠাঁই পায়। পরবর্তীকালে এই খাবারই বিরিয়ানি নামে পরিচিতি পায়।

আবার অনেকের মতে ভারতে বিরিয়ানি এসেছে দক্ষিণ মালাবার উপকূল থেকে। সেই সময় সেখানকার মানুষজন ভারতে আসতেন ব্যবসার কাজে। তাদের থেকেই এসেছে বিরিয়ানি।

কলকাতা ও বিরিয়ানির গোড়ার কথা-

কিন্তু এতো গেল গোটা ভারতের কথা। কিন্তু আপামর বাঙালি সমাজ কিভাবে বিরিয়ানি কে আপন করে নিল? সেই ইতিহাস জানতে ফিরে যাওয়া যাক ১৫০ বছর আগে। সালটা ১৮৫৬, দিনটা ৬ই মে। সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক আগের ঘটনা। নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ কলকাতা এসে পৌঁছালেন। কারণ ব্রিটিশ সরকার তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল। তাই তিনি কলকাতা হয়ে লন্ডন যাবেন ভেবেছিলেন, রাণীর কাছে সম্পত্তি ফেরানোর আবেদন নিয়ে। কিন্তু ভগবানের কি নির্মম পরিহাস! শারীরিক অসুস্থতার জন্য তার আর লন্ডন যাওয়া হলো না। তাই তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজে পাকাপাকি থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। কথাতেই আছে ‘কারোর পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’, আর এক্ষেত্রে নবাবের ‘সর্বনাশ’ হলেও, আপামর কলকাতাবাসীর জন্য ‘পৌষ মাস’ই হল। কারণ নবাবের জন্যই কলকাতাবাসীর বিরিয়ানি খাওয়ার সাধ মিটিলো।

ওয়াজেদ আলী শাহ কলকাতায় যখন থেকে বসবাস করতে শুরু করলেন, তখন থেকেই বিভিন্ন নবাবী আদব-কায়দা চালু করলেন। কলকাতা শহর সেই প্রথমবার দেখেছিল গঙ্গার দুপাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে রংবেরঙের ফানুস। মেটিয়াবুরুজের ১১ নং. বাংলোতে স্থান হয়েছিল নবাবের, মাসিক ৫০০ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে। যা কিনা ছিল বর্ধমানের রাজার সম্পত্তি।

আরও পড়ুনঃ অস্কারে জাল্লিকট্টু!

কলকাতার রাঁধুনিদের খাবার লখ্নৌই নবাবের মোটেই পছন্দ ছিল না। নবাব সম্পর্কে বলা হত, ‘খানে অউর খিলানে কা শকিন’। আর তাইতো সুদূর লখনৌ থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল নবাবের খাস রাঁধুনিদের। এদের রান্নার জাদুতেই শহর কলকাতা সেই প্রথমবার বিরিয়ানির গন্ধ পেয়েছিল। সময় তো আর থেমে থাকে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লখনৌ বিরিয়ানির সাথে কলকাতার বিরিয়ানি গাঁটছড়া বাঁধল। যেখানে নতুন রূপ পেল আমাদের কলকাতা শহরের বিরিয়ানি। বলা যেতে পারে, বিরিয়ানি কিভাবে রাধতে হয় কলকাতা তা শিখল নবাবের রাঁধুনিদের থেকেই।

বিরিয়ানিতে আলুর উৎপত্তি-

তবে এখন প্রশ্ন হল, ভারতের কোন জায়গার বিরিয়ানিতে আলু না থাকলেও কলকাতার বিরিয়ানিতে আলু থাকে কেন? এইটিও হলো নবাবের কারসাজি। ইংরেজ সরকার যেহেতু তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল, তাই টাকার ঘাটতি তো একটা ছিলই। আবার অন্যদিকে ‘খানেকা শকিন’ আবার ধরুন খাবারের তালিকায় বিরিয়ানি থাকা জরুরী হয়ে গিয়েছিল। আর কলকাতায় মাংসের দামও নেহাত কম ছিল না। তাই মাংসের পরিবর্তে আলুর ব্যবহার করা হলো তখন থেকেই। দামে কম, অথচ স্বাদে হিট। ওয়াজেদের কাছে সেটা কম খরচের খাবার হলেও, বাঙালির কাছে বিরিয়ানিতে আলুটা এখন মাস্ট। আবার অন্যদিকে ভারতের অন্যান্য জায়গার বিরিয়ানির তুলনায় কলকাতার বিরিয়ানিতে মসলার পরিমানও থাকে কম। তার একটাই কারণ, নবাব। কম খরচের বিরিয়ানি করতে গেলে, মশলাপাতি তো কম দিতেই হবে।

আরও পড়ুনঃ লাভ জিহাদ ষড়যন্ত্র?

এরপরই নবাবের রাঁধুনির কাছ থেকে বাঙালি রাঁধুনীরা শিখে নিলো লালস্যময়ী বিরিয়ানির রেসিপি। অনেকে আবার সেই সময় বিরিয়ানি রাঁধা শিখে বিরিয়ানির দোকান খুলেও বসে ছিলেন। সেই থেকেই বিরিয়ানি ক্রমেই কলকাতা শহরের জনপ্রিয় খাবার হয়ে ওঠে। যা এখন সাধারণ মানুষের হেঁসেল অব্দি এসে পৌঁছেছে।

“নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান
বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।”
এই প্রবাদটি বিরিয়ানির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ঠিক এভাবেই উৎপত্তি নিয়ে গোলমাল থাকলেও, নানা জন নানা মত দিলেও, বিরিয়ানির রং-স্বাদ- গন্ধের জুড়ি মেলা ভার।